6

ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে বাংলাদেশ অনেকদূর এগিয়ে গেছে বলতেই হয়। সরকারের জোরালো পদক্ষেপের ফলে বিগত কয়েক বছরে ডিজিটাল বা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন ব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, জনসেবাসহ বিভিন্ন খাতে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন লক্ষ করা যায়। বর্তমানে সারাদেশ ৪-জি নেটওয়ার্কের আওতায় প্রবেশ করেছে। সংবাদ মাধ্যমের বরাতে জানা যাচ্ছে যে, ২০১৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ৫-জিও চালু করবে। ইতোমধ্যে সারাদেশে মোট ৫,২৭৫ টি ইউনিয়নকে ০ ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের আওতাভুক্ত করা হয়েছে যা প্রান্তিক পর্যায়ের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর নিকট জীবন ঘনিষ্ঠ নানাবিধ বিষয় যেমন- পরীক্ষার ফলাফল, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির তথ্য, চাকুরী বিষয়ক তথ্য, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, ই-মেইল যোগাযোগ, জন্ম-মৃত্যুর নিবন্ধন, মোবাইল ব্যাংকিংসহ বিবিধ সরকারি সেবা প্রদানে সহায়তা করছে।

ই-কমার্স হলো ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি যেমন ব্যক্তিগত কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাবলেট, মোবাইল ফোন ইত্যাদি ব্যবহার করে ওয়েব ও ইলেক্ট্রনিক ডাটা আদান-প্রদানের  মাধ্যমে সকল প্রকারের ভৌত এবং ডিজিটাল পণ্য ও সেবা ক্রয়-বিক্রয় করাকে বোঝায়। এটি মূলত অনলাইনে ব্যবসা পরিচালনার একটি আধুনিক ডিজিটাল মাধ্যম, যা সরকারের বিভিন্ন ক্ষেত্রসমূহের মধ্যে সমন্বয় সাধন, ব্যবসায়িক লেনদেন ও যোগাযোগ সহজীকরণ এবং সারাদেশে  ব্যাপকহারে কর্মসংস্থানের  সুযোগ সৃষ্টি করে। ক্রমবিকাশমান বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার কারণে ই-কমার্সের পরিধি এবং জনপ্রিয়তা বিশ্বব্যাপী বেড়ে চলেছে।

ই-কমার্স খাতের উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক দিকগুলো হলো-

  • ক) আন্তর্জাতিক মূল্য প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ততা হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি;
  • খ) বিশাল বাজারে প্রবেশ ও গবেষণার অবাধ সুযোগ সৃষ্টি;
  • গ) অভ্যন্তরীণ বাজারের দক্ষতা উন্নয়ন ও বৃদ্ধি;
  • ঘ) সহজ ও স্বল্প লেনদেন ব্যয়;
  • ঙ) নতুন রপ্তানী বাজার সৃষ্টি ও রপ্তানী আয় বৃদ্ধি;
  • চ) এসএমইসহ চাহিদাভিত্তিক নতুন শিল্পায়ন;
  • ছ)  ক্ষেত্রভিত্তিক নতুন ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা সৃষ্টি;
  • জ) অধিকতর নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সৃষ্টি;

 

বিশ্ব প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশ

ফ্রান্সের এক জরিপে দেখা যায় যে, ই-কমার্সের ব্যবসা পরিচালনার প্রকৃতির কারণে একটি চাকুরী হারালে ২.৪ টি নতুন চাকুরী প্রাপ্তির সুযোগ সৃষ্টি হয়।

এক জরিপে দেখা গেছে, আগামী ২৫ বছরে বাংলাদেশেও আনুপাতিক হারে তরুণদের সংখ্যা সর্বাধিক বৃদ্ধি পাবে। এ প্রেক্ষিতে ই-কমার্স খাত বিকাশের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা গেলে বাংলাদেশের জন্য একটি অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। এড়ষফসধহ ঝধপযং ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন  যে,  বাংলাদেশ “Next Eleven” গ্রুপের অন্যতম সদস্য হিসেবে সামর্থ্য ও সম্ভাবনার কারণে ২১-শতকের অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটির ৬৫% মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। সংখ্যার দিক থেকে তাই বাংলাদেশ শুধুমাত্র বৃহৎ (জনসংখ্যার দিক থেকে পৃথিবীতে ৮ম) নয়; বরং যুব সম্প্রদায়ের সংখ্যার দিক থেকে বৃহৎ একটি দেশ। প্রতি বছর গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭% এবং বর্ধিষ্ণু নগরায়ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আয় বাড়িয়ে দিয়েছে। দেশের এ মধ্যবিত্ত শ্রেণীই ই-কমার্স কর্মকান্ডের মূল চালিকাশক্তি হবে।

বাংলাদেশে ই-কমার্স খাতের বর্তমান অবস্থা

UNCTAD ১৩০টি দেশের ই-কমার্স খাতসমূহ নিরীক্ষান্তে B2C E-commerce Index প্রস্তুত করেছে। দেখা যায় যে, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা একটি দেশের ই-কমার্স খাতের অবস্থান নির্ণয়ের প্রধান সূচক হিসেবে কাজ করে। ২০১৫ সালে ITU কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বৃদ্ধির হার ১৪%; শুধুমাত্র এই একটি প্রতিবেদনের তথ্যের সাথে বিটিআরসি’র সংখ্যার (৩৯%) গরমিল পরিলক্ষিত হয়। উল্লেখ্য, ITU-এর প্রতিবেদন বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে প্রত্যাখ্যান করেছে।

দেশে ই-কমার্স কর্মকান্ড দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতি মাসে নতুন নতুন সাইটের আগমন ঘটছে। যদিও এ খাতের বর্তমান অবস্থা এবং ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রির সঠিক সংখ্যা সম্পর্কে খুব একটা গবেষণা পরিচালিত হয়নি; তবে Kaymu.com.bd সম্প্রতি প্রকাশিত  ‘A Report on e-commerce Trends in Bangladesh’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে ই-কমার্স খাত ধীরে ধীরে উন্নতি করছে। Kaymu-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী, ই-কমার্স খাতে লেনদেন প্রতিবছর কমপক্ষে ১০% বৃদ্ধি পাবে।

ই-কমার্সের  ক্রেতারা  মূলত শহরকেন্দ্রিক; তন্মধ্যে ৮০% ক্রেতার ঢাকা, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের। এদের মধ্যে ৩৫% ঢাকার, ৩৯% চট্টগ্রামের এবং ১৫% গাজীপুরের অধিবাসী। অন্য দু’টি  শহর  হলো  ঢাকার  অদূরে  নারায়ণগঞ্জ  এবং  আরেকটি মেট্রোপলিটান শহর সিলেট। ৭৫% ই-কমার্স ব্যবহারকারীর বয়স ১৮-৩৪-এর মধ্যে।

বাংলাদেশে ই-কমার্স খাতের বিকাশের চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতের সুনির্দিষ্ট কতিপয় চ্যালেঞ্জ নিম্নে তুলে ধরা হলো-

  • ই-কমার্স সহায়ক উপযুক্ত জাতীয় নীতিমালা;
  • ই-কমার্স উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ;
  • আর্থিক লেনদেনের নিরাপত্তা;
  • ধীরগতিসম্পন্ন ও ব্যয়বহুল ইন্টারনেট;
  • ডেলিভারি চ্যানেল;
  •  ইন্টার-অপারেবল অবকাঠামো;
  • দক্ষ ই-কমার্স প্রযুক্তি সহায়ক প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও মানবসম্পদের অভাব;
  • আস্থাশীল ই-কমার্স পরিবেশের অভাব;
  • অনলাইনে কেনাকাটায় জনসাধারণের অভ্যস্ততার অভাব ও ভীতি;
  • ভোক্তা অসন্তোষ নিরসনের সুনির্দিষ্ট মেকানিজমের অভাব;
  • ই-কমার্স খাতে ব্যাংকিং সুবিধা প্রদানে অনীহা;
  • ই-কমার্স খাতের বিকাশে কোনো প্রণোদনা প্যাকেজ না থাকা;
  • পর্যাপ্ত প্রচারণার অভাব ইত্যাদি।

 

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ই-কমার্সের প্রবৃদ্ধি

২০১৬ সালে বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতে ৭২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ঘটেছে যা বাংলাদেশে ই-কমার্সের ইতিহাসে  অত্যন্ত আশাপ্রদ অগ্রগতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান মতে, জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর ২০১৬-তে মোট ৩.৫৯ বিলিয়ন টাকা (৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ই-কমার্সের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে যা ২০১৫ সালে রেকর্ড মতে ২.১৬ বিলিয়ন টাকা (৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ছিলো। দেশে ডেবিট কার্ড অপেক্ষা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা অধিক এবং ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৬০ মিলিয়নের অধিক যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

এ নতুন ব্যবসা পদ্ধতিতে কোনরূপ মধ্যস্বত্বভোগীর সাহায্য ছাড়া শুধুমাত্র আইসিটি এবং ই-বাণিজ্য সম্পর্কিত মৌলিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে সম্পৃক্ত হওয়া যাবে। এ প্রেক্ষিতে, সরকারের ভিশন-২০২১ : ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অধিকতর বেগবান হবে এবং সারা দেশে রপ্তানীযোগ্য বহুমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠা, পণ্য বহুমুখীকরণ ও বাজার সম্প্রসারণ, পণ্যের প্রাধিকার নির্ধারণসহ বিভিন্ন কর্মকান্ড গতিশীল হবে।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*